দক্ষিণ পূর্ব

লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের ফ্ল্যাট জব্দ

দক্ষিণপূর্ব
দক্ষিণপূর্ব
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:১০ সকাল
পঠিত : ২৩
লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের ফ্ল্যাট জব্দ

ছবি

Degchibarictg

লন্ডনে প্রায় ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিকানা হস্তান্তর ও বিক্রি ঠেকাতে জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের হাইকোর্ট। ফ্ল্যাটটি দুর্নীতি, প্রতারণা ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে কেনা হয়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ করেছে দেশটির ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)। এ ঘটনায় বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান ‘রনি’ চৌধুরীর সম্পদ ও মালিকানা কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিজেন্টস পার্কের কাছে অবস্থিত ফ্ল্যাটটির মালিকানা যে কোম্পানির নামে, সেটি গত বছরের সেপ্টেম্বরে মাত্র এক পাউন্ডের বিনিময়ে অন্যের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এনসিএর অভিযোগ, প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। যদিও জটিল আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ আনিসুজ্জামানের স্ত্রী ও দুই মেয়ের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে দাবি তদন্তকারীদের।

বৃহস্পতিবার আদালতের শুনানিতে জানানো হয়, ফ্ল্যাটটি কেনার অর্থের বৈধ উৎস ব্যাখ্যা করতে আনিসুজ্জামানকে গত বছর ‘আনএক্সপ্লেইন্ড ওয়েলথ অর্ডার’ বা সম্পদের অজ্ঞাত উৎসসংক্রান্ত আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সম্পত্তি কেনার অর্থ কোথা থেকে এসেছে, সে বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে দাবি এনসিএর।

যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, কোনো সম্পদের অর্থের বৈধ উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে সেটি অপরাধলব্ধ সম্পদ কি না, তা নিয়ে আইনি তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আদালতে দাখিল করা তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য বিবৃতিতে ফ্ল্যাটটির প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতে একটি জটিল ও অস্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এনসিএর আইনজীবীদের ভাষ্য, কোম্পানির শেয়ার এক পাউন্ডে হস্তান্তর করা হলেও পুরো শেয়ার বিক্রির মূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন পাউন্ড।

তদন্তকারীদের দাবি, সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক থেকে ফ্ল্যাটটির বিপরীতে নেওয়া ঋণ পুনঃঅর্থায়নের সুবিধা পেতেই মালিকানা হস্তান্তরের এ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ঋণ পুনঃঅর্থায়ন হয়নি। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার পর ব্যাংকটি ফ্ল্যাটটির দখল নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছে এনসিএ।

তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নথিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং মার্কিন সংগীতশিল্পী ক্রিস ব্রাউনের জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছিল। তদন্তকারীর মতে, এ ঘটনা প্রতারণার বিষয়ে অভিযুক্তের বেপরোয়া মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়।

ভূমি নিবন্ধনের নথি অনুযায়ী, আনিসুজ্জামান তার ‘রনি ৪২ লিমিটেড’ নামের কোম্পানির মাধ্যমে ২০২৩ সালে ১২ দশমিক ৪ মিলিয়ন পাউন্ডে ফ্ল্যাটটি কেনেন। পরে কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে ‘পিএনএন ইউকে প্রপার্টিজ’ রাখা হয়।

এনসিএর তদন্ত কর্মকর্তা জুলাই মাসে দেওয়া সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন, আনিসুজ্জামান যুক্তরাজ্যে অবস্থান করতেন এবং ফ্ল্যাটটিকে নিজের প্রধান আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করতেন।

বিচারপতি কারেন স্টেইন ফ্ল্যাটটিকে অপরাধলব্ধ সম্পদ হিসেবে বিবেচনার পক্ষে যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে বলে মত দেন। এরপর সম্পত্তিটি বিক্রি বা হস্তান্তর ঠেকাতে জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে ফ্ল্যাটটির দখল পুনরুদ্ধারসংক্রান্ত আইনি কার্যক্রম চালানোর সুযোগ রাখতে আদেশে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

আনিসুজ্জামানের আইনজীবীরা আদালতে জানিয়েছেন, তাঁরা জব্দের আবেদনের বিরোধিতা করছেন না।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, আইনজীবীদের পরামর্শে তিনি সম্পদ জব্দের আবেদনের বিরোধিতা করেননি। তবে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

আনিসুজ্জামানের ভাষ্য, এনসিএ দেওয়ানি আইনে সম্পদ পুনরুদ্ধারের মামলা করলে তিনি জোরালোভাবে তা মোকাবিলা করবেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অসত্য, তা প্রমাণ করবেন।

ফ্ল্যাটটির প্রকৃত মালিকানা গোপন করার অভিযোগও নাকচ করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, সম্পত্তি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য এনসিএর কাছে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে স্ত্রী ও সন্তানদের এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতন পর্যন্ত প্রায় ২৯৫ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশে পাচার হওয়া অর্থে কেনা সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুনে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি জব্দ করে এনসিএ। সংস্থাটি তখন জানায়, এ পদক্ষেপ চলমান দেওয়ানি তদন্তের অংশ। একই মাসে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সম্পদের অজ্ঞাত উৎসসংক্রান্ত আদেশও পায় সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের বন্ধকি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান মার্কেট ফিন্যান্সিয়াল সলিউশনসের কাছ থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরী শত শত বন্ধকি ঋণ নিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছর প্রতারণার অভিযোগের মুখে পড়ে।

এর আগে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের কাছে আনিসুজ্জামান দাবি করেছিলেন, তাঁর ভাই সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই।

আরএইচ 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।